: মুহাম্মদ মিজানুর রহমান :
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বিশ্বব্যাপী জলবায়ূ পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কম-কার্বন নির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেছে। ইউএনইপি’র তথ্যমতে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহারের বিকল্প নেই। বর্তমানে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা, নীতিগত পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উৎসাহ ঘটানোই একমাত্র চাবিকাঠী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, সোলার ও উইন্ড এনার্জির ব্যবহার বৃদ্ধি, বনভূমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত কার্বন নি:সরণ কমাতে হবে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জীববৈচিত্র রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয় তাদের কর্মপরিকল্পনায়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি থেকে জানা যায়, উন্নত দেশগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। কারিগরি জ্ঞান, গবেষণা, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পরিবেশগত ক্ষতির প্রতিক্রিয়া সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তাই টঘঊচ মনে করে, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ পরিবেশ ও জলবায়ু সংকটের মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হবে। বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করছেন, ইউএনইপি’র আহ্বান বৈশ্বিক নেতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এ বার্তার অর্থ জলবায়ু সুরক্ষা আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। কম-কার্বন, টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই এখন মানবজাতির টিকে থাকার একমাত্র পথ। বর্তমানে প্রকৃতির অবস্থা ভয়াবহ, পানি দুষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কার্বণ নি:স্বরণ থামানো যাচ্ছে না। সবুজায়নের পরিমাণ কমছে। জলাধার ভরাট হচ্ছে। পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ, মাটিকে পোড়ানো হচ্ছে, পলিথিন ব্যবহার মাত্রারিক্ত ও বন উজাড় হচ্ছে। এসব কারণেই বাংলাদেশের জলবায়ূ এখন টালমাটাল। গত ৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের ভূমিকম্পে গোটা দেশ নড়েচড়ে উঠে। শহরের মানুষ বিশেষ করে ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিলো। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, বড় বাঁধ ও জলাধার তৈরি করলে পানির বিশাল ওজন ভূ-ত্বকের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং ফল্ট লাইনে চাপের পরিবর্তন ঘটে। দেশভেদে কিছু কিছু কারণে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়ছে, যেমন-শেল গ্যাস বা তেল আহরণে মাটির গভীরে উচ্চচাপে পানি ইনজেক্ট করলে ফল্ট লাইন সক্রিয় হয়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিলে মাটি বসে যায়। ভূগর্ভে ইনজেক্ট করলে চাপ বাড়ার ফলে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়। এদিকে পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তার মধ্যে পরিবেশ দূষণকারী শিল্পগুলোতে ‘পরিবেশ সুরক্ষা সারচার্জ’ এবং একাধিক গাড়ির মালিকদের ওপর ‘কার্বন ট্যাক্স’ আরোপ। ২০৫০ সালের মধ্যে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে ৫ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে আরও ১৫ শতাংশ কার্বন নি:সরণ কমানোর অঙ্গীকার। অন্যদিকে দ্যৈুতিক বাস ও গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগের আহ্বান। আমাদের সৌর, বায়ূ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি করা উচিত। এতে করে কার্বন নি:সরণ কমাতে সহায্য করবে। পরিবহন এবং বাসাবাড়িতে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। বনভূমি রক্ষা করা, নতুন বন তৈরি করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা জরুরি। কারণ এগুলো কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশবান্ধব এবং পুনর্জন্মমূলক কৃষি পদ্ধতির গ্রহণ কার্বন নি:সরণ কমাতে সাহায্য করে। নদী তীর সুরক্ষা, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ ও নিষ্কাশন খাল খননের মতো কার্যক্রম জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসময় জলবায়ূ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য এবং দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে কমিউনিটি পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার উপর নজরদারি বাড়ানো উচিৎ। আসলে আমাদের পৃথিবী, দেশ, জাতি, পাশু-পাখি, গাছ-পালা, সমুদ্র-মহাসমুদ্র, নদী-খালকে রক্ষা করার দায়িত্ব মানবকুলের যা থেকে পরিত্রানের কোন উপায় নেই। এটা নিশ্চিত পরিবেশ ও জল-বায়ূ রক্ষায় সকলের সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্প নাই।