• ঢাকা, বাংলাদেশ বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ন

একজন মাহাথির মোহাম্মদ

রিপোর্টার নাম: / ১৮৯ জন দেখেছে
আপডেট: শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫

মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের প্রধান শহর আলোর সেতারে জন্মগ্রহণ করেন মাহাথির মোহাম্মদ। তাঁর দাদা ভারতের কেরালা থেকে অভিবাসন নিয়ে এক মালয় নারীকে বিয়ে করেন। ছোটবেলা থেকেই তুখোড় মেধাবী মাহাথিরের বাবা মোহাম্মদ ইস্কান্দার ছিলেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রধান শিক্ষক। শৈশবেই ছেলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও একাগ্রতার বীজ বপন করেন তিনি। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন মাহাথির।

চিকিৎসা শিক্ষার্থী থেকে রাজনীতিতে

চল্লিশের দশকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শুরু করেন মাহাথির। সেখানেই পরিচয় হয় সহপাঠী সিতি হাসমাহর সঙ্গে, যা পরিণত হয় বিবাহে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মেডিকেল কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে কফি ও চকলেট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।

গাইনোকোলজিতে এমবিবিএস শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং নিজ শহর আলোর সেতারে চিকিৎসা শুরু করেন। তখন শহরে একমাত্র চিকিৎসা চেম্বার ছিল তাঁরই। তবে তিনি উপলব্ধি করেন, চিকিৎসা পেশায় সীমিতসংখ্যক মানুষের উপকার করা সম্ভব; কিন্তু রাজনীতির মাধ্যমে বিপুল মানুষের সেবা করা যায়। এই ভাবনা থেকেই ১৯৬৪ সালে রাজনীতিতে পা রাখেন, বয়স তখন প্রায় ৪০।

পারিবারিক জীবন

মাহাথির-সিতি দম্পতির এক মেয়ে ও চার ছেলে—বড় মেয়ে মেরিনা। পরে তাঁরা আরও দুটি সন্তান দত্তক নেন।

সময়নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা

১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অফিসে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছানো এবং এক মিনিটও দেরি না করার অভ্যাস নিয়ে তাঁর বহু গল্প প্রচলিত। তাঁর প্রিয় উক্তি—‘আমাদের বাঁচার জন্য খাওয়া উচিত, খাওয়ার জন্য বাঁচা উচিত নয়।’

স্থূলতা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এ বিশ্বাসে তিনি নিজের ওজন সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যদর্শন

শরীরের চাহিদার চেয়ে বেশি খাবার খাওয়া ক্ষতিকর বলে মনে করেন তিনি। কোমরের চারপাশে চর্বি জমে গেলে খাবারের পরিমাণ কমানোর পরামর্শ দেন। ভাত ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চললে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে—এ অভ্যাসে তিনি ৩৫ বছর ধরে নিজের ওজন ৬২ থেকে ৬৪ কেজির মধ্যে রেখেছেন।

মালয়েশিয়ায় স্থূলতা একটি বড় সমস্যা। নারকেলের তেলে রান্না, ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তা ও স্বাদযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে পাকস্থলি স্ফীত হয়ে আরও বেশি খাবারের চাহিদা তৈরি হয়, যা লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াসের ওপর চাপ ফেলে, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।

২০০৭ সালে তিনি দু’বার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এবং বাইপাস সার্জারির পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে গ্রিল করা মহিষের মাংস তেঁতুল সস দিয়ে এবং মুরগির মাংসের রোটি চেনাই। মাছের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে তাঁর।

সক্রিয় জীবনধারা

৬০ বছরের বেশি বয়সী বা অবসরপ্রাপ্তদের জন্য তাঁর পরামর্শ—সবসময় সক্রিয় থাকতে হবে, হাঁটতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবে। দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পক্ষে নন তিনি। সকাল থেকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং প্রতিদিন গড়ে সাত ঘণ্টা ঘুমান। বেশি ঘুম শরীর দুর্বল করে—এ বিশ্বাসে তিনি কম ঘুম ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে পেশি ও হাড় শক্ত রাখেন।

মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখার কৌশল

মাহাথির মনে করেন, মস্তিষ্ককে ব্যবহার না করলে তা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ব্রেন সক্রিয় রাখতে কথা বলা, বই পড়া, লেখা, সমস্যার সমাধান, যুক্তি ও বিতর্কে অংশ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়া মানসিক সতেজতা ও মনোবল বৃদ্ধির কার্যকর উপায়।

লেখালেখির প্রতি অনুরাগ

মেডিকেল ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন তিনি। ‘ছেদেত’ ছদ্মনামে সংবাদপত্রে কলাম লিখেছেন এবং এখনো মালয় ও ইংরেজি ভাষায় ব্লগ পরিচালনা করছেন। ব্লগটির ভিউ ইতিমধ্যে তিন কোটিরও বেশি। তাঁর মতে, লেখালেখি ব্রেনকে সবসময় তীক্ষ্ণ রাখে।

জীবনদর্শনের সারকথা

ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, সামরিক কর্মকর্তার মতো সোজা ভঙ্গি, শর্করা কম খাওয়া, শাকসবজি ও মৌসুমি ফলমূল বেশি খাওয়া—এসবই তাঁর সুস্থ জীবনের রহস্য। তাঁর মতে—‘দীর্ঘায়ু পাওয়া এক বিষয়, কিন্তু দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু আমাদের হাতে নেই, তবে যেটুকু আছে, তা মেনে চললে বার্ধক্যেও সুস্থ থাকা যায়। জার্নাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরিতে আরও নিউজ