দীর্ঘ ইতিহাস ও গভীর ধর্মীয় গুরুত্বে সমৃদ্ধ ফিলিস্তিন আজ এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি। চলমান সংঘাত ও যুদ্ধের ফলে লাখো ফিলিস্তিনি চরম দুর্ভোগের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আন্তর্জাতিক মহলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ফিলিস্তিন বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রায় আট হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত আরিহা (জেরিকো) নগরী মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম বসতিগুলোর একটি বলে বিবেচিত। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কেনআনি ও ইয়াবুসি জাতিসহ নানা জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলে বসবাস করেছে। প্রাচীন যুগে অঞ্চলটি ‘আরদে কেনআন’ নামেও পরিচিত ছিল।
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আগমনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে তাওহিদের দাওয়াত নতুন মাত্রা লাভ করে। পরবর্তীতে হযরত ইসহাক (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.) এবং বনি ইসরাইলের বংশধররা এখানে বসতি স্থাপন করেন। হযরত দাউদ (আ.) ও হযরত সুলায়মান (আ.)-এর শাসনামলে জেরুজালেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও বহিরাগত আক্রমণের ফলে সেই শাসনের অবসান ঘটে এবং অঞ্চলটি পর্যায়ক্রমে ব্যাবিলনীয়, পারসিক ও রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়।
আধুনিক যুগে ফিলিস্তিন সংকটের বড় মোড় আসে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৪৭–৪৯ সালের সংঘাতে শত শত ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস হয় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়—যা ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফিলিস্তিনিরা এ ঘটনাকে ‘নাকসা’ বা দ্বিতীয় বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করে।
বর্তমানে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ ও ভূমি দখল নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসি নির্বাহী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আইনি ও জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগের নিন্দা জানায়। বাংলাদেশ জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে, এ ধরনের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।
বাংলাদেশ পুনরায় ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে পূর্ব জেরুজালেম হবে রাজধানী। একই সঙ্গে গাজা উপত্যকায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব কেবল রাজনৈতিক সংলাপ জোরদার করা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। M.M.R