জার্নাল ডেস্ক: আমি পরীক্ষা কক্ষে চারপায়ীর উপরে বসিয়া, কলম হস্তে নিমীলিত নয়নে ঝিমাইতেছিলাম। চারিদিকে ফার্মাকোলজি, প্যাথোলজি ও মাইক্রোবায়োলজির ভারী গন্ধে বাতাস যেন স্নায়ুর উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিতেছিল। গতরাত্রি জাগিয়া পড়াশোনা করিলেও মস্তিষ্কে কোনও কিছু আর সঞ্চিত থাকিল না; সিম্প্যাথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক ক্রিয়ার পার্থক্যও গুলাইয়া গেল।
পাশের বেঞ্চে আশরাফ ভাই দিব্যি নিশ্চিন্তচিত্তে নকলপত্র লিখিতেছে; mnemonic রূপে সে লিখিতেছে—‘Some Say Marry Money But My Brother Says Big Brain Matter More’ ক্র্যানিয়াল নার্ভের কার্য স্মরণের নিমিত্তে। আমি চক্ষু নিমীলন করিয়া ভাবিতেছিলাম—‘হায়, যদি আমি সাইয়েদুর মহাশয় হইতাম, তবে নিজের খাতায় নিজেই শতভাগ নম্বর দিতাম।’
এমন সময় হঠাৎ পেছন দিক হইতে মধুর এক স্বর শোনা গেল—বাহ!
চক্ষু মেলিয়া দেখিলাম, তিনি সাইয়েদুর মহাশয় নহেন; অজ্ঞাত এক নবীন পরীক্ষক। তিনি হস্তে ধারণ করিয়াছেন আশরাফের প্রদত্ত সেই নকলপত্র। তাতে অঙ্কিত রহিয়াছে—
পরীক্ষক মহাশয় রহস্যময় ম্লান হাসি হাসিতেছেন; মনে হইল তিনি ভাবিতেছেন—‘কেহ রাত জাগিয়া মস্তিষ্ক ছেঁচিয়া পড়ে, কেহ আশরাফের নকল হইতে পাস করিতে চাহে—বাহ!’
আমার হৃৎপিণ্ড তখন প্রায় arrhythmia-র পথে। মনে হইল, যেন অতি শীঘ্রই defibrillator প্রয়োজন হইবে।
পরীক্ষক বলিলেন, ‘তুমি তো অদ্ভুত বালক! চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র হইয়া নকলের আশ্রয় গ্রহণ করিতেছ? আজ যদি আমি viva নিতাম, এবং জিজ্ঞাসা করিতাম—পেনিসিলিন কেন জীবাণুর কোষপ্রাচীরে ক্রিয়া করে এবং কেন গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুতে তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর?—তুমি কি উত্তর দিতে পারিতে?’
আমি কাঁপিত কণ্ঠে বলিলাম, ‘স্যার, সত্যই বলিতেছি, পারিতাম না। তবে আজ হইতে চেষ্টা করিব।’
পরীক্ষক ম্লান হাসিতে বলিলেন, ‘শোন, নকল করিয়া ডাক্তার হইলে রুগী বাঁচে না। আজ তোমাকে বহিষ্কার করিতে পারি, কিন্তু একখানি শর্তে তোমাকে মুক্তি দিতেছি।’
আমি ভয়ে কাঁপিয়া বলিলাম, ‘কি শর্ত, স্যার?’
‘আজ হইতে যথাযথ অধ্যয়ন করিবে। পরবর্তী viva-তে আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, পেনিসিলিনের কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা কর, তুমি স্বপ্ন হইতে জাগিয়াও উত্তর দিবার মত প্রস্তুত থাকিবে। আর আশরাফকে বলিবে—ওর হস্তাক্ষর সুন্দর, কিন্তু কর্ম তাহার অনুচিত।’
আমার বুকের উপর হইতে যেন ক্যাটজাংয়ের ফার্মাকোলজি গ্রন্থের ভার অপসারিত হইল। আমি প্রতিজ্ঞা করিলাম, ‘জি স্যার, আর নকল করিব না। mnemonic বানাইয়া রাত জাগিয়া পড়িব, কিন্তু শর্টকাট ব্যবহার করিব না।’
পরীক্ষক নকলখানি ছিঁড়িয়া ফেলিলেন এবং আমার খাতা ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন, ‘যাও, নিজ বুদ্ধি দ্বারা লিখিয়া দেখাও। মনে রাখিবে—পাস করিলে ডাক্তার, ফেল করিলে পুনরায় ডাক্তার, কিন্তু নকল করিলে কেবল লজ্জা।’
সেই দিন হইতে বুঝিলাম, চিকিৎসাশাস্ত্রে শর্টকাটের স্থান নাই। পরিশ্রমের দ্বারা পাস করিয়াছি—এই হইল প্রকৃত গৌরব। আর আশরাফ? সে আজও mnemonic রচনা করে, কিন্তু আর নকল করে না।