তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার নদীপারের মানুষের প্রায় ১০০ কিলোমিটারজুড়ে মশাল মিছিল এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণÑ এই দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই আন্দোলনকে শুধু একটি আঞ্চলিক দাবি হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি বৃহত্তর অর্থে দেশের ‘রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যুগান্তকারী আধুনিক গ্রিন পলিটিক্স’ এবং অন্ধ ‘ভারতবিদ্বেষের বদলে জাতীয় সংহতির নীতি’র উত্থানের ইঙ্গিত বহন করে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ১৯ দফা থেকে ৩১ দফার বিবর্তন এই প্রেক্ষাপটে ‘নয়া বাংলাদেশপন্থার’ সন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নথি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও গ্রিন পলিটিক্সের উত্থান : তিস্তা নদীর করুণ দশা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। উজানের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এই নদী এখন বর্ষায় প্রলয়ংকরী বন্যার কারণ এবং শুকনো মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা মূলত নদীশাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি বহুমুখী উদ্যোগ।
এই পরিকল্পনার দাবিতে নদীপারের মানুষের মশাল মিছিল প্রমাণ করে যে, পরিবেশ ও অর্থনীতি এখন আর কেবল বিশেষজ্ঞ বা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি সরাসরি গণ-আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ স্লোগানটি কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা ও ডাক নয়, এটি একটি গভীর আর্তনাদÑ উত্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত জাগরণ।
এই আন্দোলনকে ‘যুগান্তকারী আধুনিক গ্রিন পলিটিক্স’ হিসেবে বিবেচনার কারণ হলো : প্রথমত, পরিবেশকেন্দ্রিক জনস্বার্থের বিবেচনায় আন্দোলনটির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নদীকে বাঁচানো এবং এর মাধ্যমে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এটি চিরাচরিত ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দাবির চেয়ে বৃহত্তর পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দাবি। দ্বিতীয়ত, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে রাজনৈতিক দল বা নেতার নির্দেশের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের (কৃষক, জেলে, শিক্ষক, ভূমিহীন) এই গণ-উদ্যোগ দেখায় যে, মানুষ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ার চেষ্টা করছে। এটা রাজনীতিতে ‘বটম-আপ’ অ্যাপ্রোচের প্রকাশ, যা তথাকথিত রক্ষণশীল, এলিটকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে আধুনিক গণতান্ত্রিক চর্চার উদাহরণ। সবশেষে নয়া জাতীয় সংহতির সম্ভাবনার সূত্রে, এই আন্দোলন উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক সমস্যাকে জাতীয় এজেন্ডায় নিয়ে এসেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক বঞ্চনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘জাতীয় সংহতি’ তৈরি করতে পারে।
অন্ধ ভারতবিদ্বেষের বদলে জাতীয় সংহতির নীতি : তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কিন্তু মশাল মিছিলের মাধ্যমে যে গণ-উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান লক্ষ্য ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন’, যার জন্য চীন বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়ন পাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। এই আন্দোলন পানি সমস্যার জন্য কেবল ভারতকে অন্ধ দোষারোপ না করে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছে।
‘ভারতবিদ্বেষের বদলে জাতীয় সংহতির নীতি’ বলতে বোঝায় : একদিকে সমস্যার স্থানান্তরণের রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে জনগণের মনোযোগ আন্তর্জাতিক বিরোধ থেকে সরিয়ে এনে নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে আনা হচ্ছে। নদী বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবেÑ এই বাস্তব উপলব্ধিই হলো নতুন নীতি। অন্যদিকে আঞ্চলিক উন্নয়নই প্রধান হাতিয়ার; তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের উন্নয়নই এখানে প্রধান ‘জাতীয় সংহতি’র ভিত্তি, যা কোনো একটি বিদেশি শক্তির বিরোধিতার চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক ও কার্যকর। তৃতীয়ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতির কূটনীতিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ভারতবিদ্বেষকে পুঁজি না করে, জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা (যেমনÑ চীনের অর্থায়ন) গ্রহণ করা একটি প্রাজ্ঞ ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এটি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’- এই চিরাচরিত বৈদেশিক নীতির আধুনিক প্রয়োগ।
বিএনপির ১৯ দফা থেকে ৩১ দফা : নয়া বাংলাদেশপন্থার খোঁজ : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ‘১৯ দফা কর্মসূচিতে’ মূলত কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে উৎসাহ এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল গ্রামীণ অর্থনীতি ও শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করার দর্শন ছিল। এটি ছিল সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির জন্য প্রথম ধাপে মৌলিক সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের পথনির্দেশ।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিককালে বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা রূপরেখা’ দেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাবনা। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা (উচ্চকক্ষ) প্রবর্তন, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
এই দুটি দফার বিবর্তন বা পার্থক্য থেকেই ‘নয়া বাংলাদেশপন্থার খোঁজ’ করা যায় :
বৈশিষ্ট্য ১৯ দফা (১৯৭৮) ৩১ দফা (২০২৩) নয়া বাংলাদেশপন্থার ইঙ্গিত : মূল লক্ষ্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা। শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রকাঠামোর মেরামত। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও শাসনতান্ত্রিক মজবুতি।
গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র- কৃষি, শিল্প, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, নির্বাহী ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য।
রাজনৈতিক দর্শন- জাতীয় সংহতি, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা, সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা (‘রেইনবো নেশন’), সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, ‘উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’, বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি। বৈদেশিক নীতি- সব বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব। সুসম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার। ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মোকাবিলায় কৌশলী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থান।
জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার স্বপ্ন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো ইস্যুতে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং উন্নয়নভিত্তিক গণ-আন্দোলনকে সমর্থন করার কৌশলটি তাদের ৩১ দফার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনগণের অধিকারের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা দিয়ে দলটিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার একটি কৌশলও হতে পারে।
নয়া বাংলাদেশপন্থা : তিস্তা মহাপরিকল্পনাকেন্দ্রিক গণ-আন্দোলন এবং বিএনপির ১৯ দফা থেকে ৩১ দফায় উত্তরণÑ এই দুটি ঘটনা একটি ‘নয়া বাংলাদেশপন্থার’ জন্ম দিচ্ছে, যার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ : গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনর্মূল্যায়নে কেবল ভোটাধিকার নয়, পরিবেশ, উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের অধিকারও যে গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই আন্দোলন তা প্রমাণ করেছে।
তিস্তাপারের মশাল মিছিল এবং ৩১ দফার রূপরেখা একসূত্রে গাঁথা। এই সূত্রটি হলো : একটি নতুন এবং উন্নত বাংলাদেশ, যা তার পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে, একটি শক্তিশালী শাসনতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করবে এবং আবেগের রাজনীতিকে পেছনে ফেলে বাস্তবসম্মত উন্নয়নের পথে এগোবে। এই ‘নয়া বাংলাদেশপন্থা’র সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে দক্ষতার সঙ্গে সামলানোর ওপর। রাফসান আহমেদ : নৃবিজ্ঞানী, দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক, চলচ্চিত্রকার।