বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে| একসময় শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবন পাল্টে দিয়েছিল, এরপর এসেছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন| আর এখন আমরা প্রবেশ করেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর যুগে| প্রতিদিন এমন সব প্রযুক্তি ˆতরি হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও মানুষের কল্পনার বাইরে ছিল| লেখা, ছবি, ভিডিও, গান, গবেষণা, চিকিৎসা, শিক্ষা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনে দিচ্ছে| এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি কেবল আশীর্বাদ, নাকি এর সঙ্গে এমন কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে|
এআই মানুষের কাজকে সহজ করছে তা ঠিক| কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন হচ্ছে| একজন শিক্ষক পাঠ পরিকল্পনা করতে পারছেন দ্রুত, একজন চিকিৎসক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা পাচ্ছেন, একজন সাংবাদিক খবরের খসড়া ˆতরি, তথ্য গুছানো বা ছবি ও ভিডিও নির্মাণে নানা সুবিধা পাচ্ছেন| ব্যবসা, কৃষি, চিকিৎসা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ভাষা অনুবাদ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক | প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে| অর্থাৎ, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই মানবকল্যাণে একটি শক্তিশালী সহায়ক|
প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকে সুপ্ত নেতিবাচক দিক, তবে প্রতিটি প্রযুক্তিরই সুফল যেমন তেমন কুফলও| এআইও তার ব্যতিক্রম নয়| অনেক সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক পেশার ধরন বদলে যাচ্ছে| কিছু কাজ হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রই করবে| এর ফলে কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতার প্রয়োজন হবে| যারা নিজেদের সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারবেন না, তাদের জন্য অসুবিধার পথ দীর্ঘ হবে| আরও বড় উদ্বেগ হলো, মানুষ যদি নিজের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতার বদলে সবকিছু এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে ব্যক্তিগত দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার আশঙ্কা ˆতরি হবে| প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, চিন্তার অভ্যাস হারিয়ে গেলে তা কোনো সমাজের জন্যই শুভ হবে না|
বর্তমান প্রজন্ম ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে বড় হচ্ছে| তাদের কাছে এআই একটি ¯^াভাবিক বাস্তবতা| তারা দ্রুত তথ্য খুঁজে পায়, দ্রুত শেখে এবং দ্রুত কাজ শেষ করতে চায়| কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও উঠে আসে—গতি কি সবসময় গভীরতার বিকল্প হতে পারে? জ্ঞান কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়; তা হলো পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, যুক্তি, মানবিকতা ও মূল্যবোধের সমš^য়| তাই নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তির পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, বই পড়ার অভ্যাস এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মূল্যও বুঝতে হবে| একসময় মানুষ চিঠি লিখত| ঈদের শুভেচ্ছা হাতে লেখা কার্ডে পৌঁছাত| আত্মীয়-¯^জনের বাড়িতে না গেলে সম্পর্ক পূর্ণ হতো না| বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা ছিল জীবনের ¯^াভাবিক অংশ| আজ যোগাযোগ অনেক সহজ| এক মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভিডিও কলে কথা বলা যায়| কিন্তু প্রযুক্তির এই সুবিধার মাঝেও অনেকেই অনুভব করেন, সম্পর্কের ধরন বদলে গেছে| একই ঘরে বসে থেকেও পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় আলাদা আলাদা ডিজিটাল প্লাটফর্মে ব্যস্ত থাকেন| অনলাইন সংযোগ বাড়া নিজেদের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার সময় কমেছে| প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, তবে সম্পর্কের গভীরতা ধরে রাখার দায়িত্ব এখনও মানুষেরই| অনেক প্রবীণ মানুষের মনে হয়, আগের জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ ও শান্ত| তখন তথ্যের চাপ কম ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম প্রতিযোগিতা ছিল না, প্রতিটি মুহূর্ত অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা এতটা ছিল না| অন্যদিকে বর্তমান যুগে মানুষ প্রায় সারাক্ষণ নোটিফিকেশন, খবর, মন্তব্য ও তথ্যের প্রবাহে ঘেরা| এতে কাজের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি মানসিক চাপ ও রোগ অনেকের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে| তবে এটিও সত্য যে বর্তমান যুগে চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও ˆবশ্বিক যোগাযোগের সুযোগ অতীতের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে| তাই অতীত ও বর্তমান—উভয়েরই শক্তি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে| এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, বিপুল পরিমাণ তথ্য মনে রাখতে পারে এবং নির্দিষ্ট কাজ মানুষের চেয়ে দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে| কিন্তু মানুষের বিবেক, ˆনতিক বিচার, সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন কিংবা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তো এআইয়ের নেই| এআই তো শিখিয়ে দেয়া তোতা পাখি| প্রযুক্তি মানুষের সহকারী হতে পারে, কিন্তু মানুষের মানবিক সত্তার বিকল্প হতে পারে না|
এআইকে ভয় পাওয়ারও প্রয়োজন নেই, আবার অন্ধভাবে নির্ভর করারও প্রয়োজন নেই| ইতিহাস বলে, প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলেছে| কিন্তু সেই পরিবর্তন কল্যাণকর হবে নাকি ক্ষতিকর—তা নির্ভর করে নিজের কাজের ওপর| আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি মানুষের সেবক হবে, মানুষ প্রযুক্তির সেবক নয়|
আজ আমরা যেমন অনেক সময় বলি, “আমরা মোবাইল ব্যবহার করছি না; বরং মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে|” এই কথাটি যেন ভবিষ্যতে এআইয়ের ক্ষেত্রেও সত্য না হয়| তা হলেই সব কিছু নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে| আমরা এআই ব্যবহার করব—জ্ঞান অর্জনে, সৃজনশীলতায়, গবেষণায়, মানবকল্যাণে এবং উন্নয়নের জন্য| কিন্তু আমাদের চিন্তা, বিবেক, মানবিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং ¯^াধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কখনোই প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া উচিত হবে না| মানুষের সৃষ্টি এআই| তাই এআইকে মানুষের কল্যাণেই কাজে লাগাতে হবে| কারণ সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতা, ধর্ম চর্চা, ˆনতিকতা এবং মানুষের নিজ¯^ চিন্তার শক্তিও সমানভাবে বিকশিত হবে|-এম এম রহমান