লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিজানুর রহমান। স্থানীয় রাজনীতিতে ‘বহুরুপী মেম্বার’ হিসেবে পরিচিত। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা ও চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত এখন একটিই আলোচনা ‘আসলে তার কোন রুপটাই সত্যিকারের? বহুরুপী মেম্বার মিজানের গল্প যেন শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না।’
সূত্র জানায়, মিজান প্রথমে বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিল। ২০০৮ সালে আ.লীগ সরকার গঠনের পর তিনি দলটির ইউনিয়ন ও উপজেলা নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। আ.লীগের ১৭ বছর অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে তিনি কখনো বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। উল্টো আ.লীগ সমর্থিত প্রার্থীর হয়ে কাজ করে নেতাদের সুনজর কেড়ে নেন। এ সুবাদ ২০১১ সালে আ.লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তিনি প্রথম মেম্বার নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য পদে আ. লীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করেন। ওই বছর উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী রামগতি উপজেলা আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ ও বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হাসান মাহমুদ ফেরদৌসের পক্ষে নির্বাচন করেন। তখন বিএনপির নেতারা মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়ে এলাকা ছাড়া। সে সময় নৌকার পক্ষে রাজপথে বুক ফুলিয়ে নেতৃত্ব দেন মিজান। দলটির বড় বড় নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়েন তিনি। ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে আলোচনার জন্ম দেন মিজান। এলাকায় তিনি এখন পরিচিত ‘বহুরুপী মেম্বার’ নামেই। যখন যে দল বা যে নেতা ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের হয়ে যান মিজান। এসব করে ফায়দা লুটে নেন তিনি।আ.লীগ আমলে কোনো মামলা-হামলার শিকার না হয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হয়ে উঠেছেন ত্যাগী বিএনপি হিসেবে।
বিগত ১৭ বছর প্রকাশ্যে নৌকার ভোট করে ৫ আগস্টের পর হঠাৎ বনে গেছেন বিএনপির ত্যাগী নেতা। দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে ভাগিয়ে নেন প্যানেল চেয়ারম্যানের পদও। বিএনপির সাইনবোর্ড দিয়ে সরকারি প্রকল্প নামমাত্র কাজ দেখানো ও লাখ লাখ টাকার অবৈধ বালুর ব্যবসা করে হয়ে যায় প্রচুর সম্পদের মালিক। বিএনপির ত্যাগী নেতারা হচ্ছেন কোণঠাসা। তার রুপ পাল্টানোর এমন শতাধিক ছবি কালর কণ্ঠের হাতে রয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, উপজেলা আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ ও বড়খেরী ইউনিয়ন আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক মো.ওসমান গনির সাথে প্রকাশ্যে নৌকা মার্কার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা চালাতে। ওই ছবিগুলা বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন ফেসবুকে পোস্ট করছেন।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মেম্বার মিজান ২০১৪ সালে আ.লীগের একতরফা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ওই বছর অনুষ্ঠিত রামগতি উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদের নির্বাচন, ২০১৭ সালে বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হাসান মাহমুদ ফেরদৌস, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হাসান মাকসুদ মিজানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন বহুরূপী মিজান। ২০১৭ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরনবী নোমানের বিরুদ্ধে গিয়ে মিজান নৌকার প্রার্থীর পক্ষে জীবনবাজী রেখে নির্বাচন করেন। সবশষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি আ. লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী ও লক্ষ্মীপুর জেলা আ.লীগের সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল-মামুনের নির্বাচন করেছেন।
এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজের সুবিধা ও প্রভাব ধরে রাখাই যেন তার মূল লক্ষ্য। যে প্রার্থীকে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাময় মনে করেন, শেষ মুহূর্তে তার পক্ষেই অবস্থান নেন তিনি। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তার রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক নির্বাচনে বারবার অবস্থার পরিবর্তনের কারণে মিজান মেম্বারকে ঘিরে জনমনে কৌতহল ও সমালোচনা দুইটাই বেড়েছে। ৫ আগস্টের পর অবৈধভাবে প্যানেল চেয়ারম্যানের পদ দখল করে মিজান তার পরিবারের ছেলে, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রীসহ শুধু আত্মীয় স্বজনের নামে ২০টি হতদরিদ্রের কার্ডও হাতিয়ে নেয়। যা নিয়ে দলের অনেক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
এদিকে ইউনিয়নটির কয়েকজন নেতা জানান, হাইব্রিড নেতা মিজান এবার বিএনপির মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে চান। এনিয়ে বিএনপির তণমূলে যথেষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বড়খেরী ইউনিয়ন বিএনপির ৩ নেতা বলেন, সামনের ইউপি নির্বাচনে মিজানকে যদি বিএনপি সমর্থন দেয়, তাহলে ওই ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিবে। তাদের প্রশ্ন ১৭ বছর আ.লীগের সাথে সম্পর্ক রেখে বিএনপিকে কোণঠাসা করে রাখা মিজান হঠাৎ বিএনপি হলো কীভাবে? দীর্ঘ সময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীরা মান-অভিমানে দল ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়।
বড়খেরী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদ উদ্দিন লালন বলেন, মিজান ১৭ বছর আ. লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছিল। সেখান থেকে মেম্বার হন। ৫ আগস্টের পর হঠাৎ বিএনপির বড় নেতা সেজে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা সে করছেনা। তার কারণে আমাদের দলের বদনাম হচ্ছে। এর কারণে অনেক নেতাকর্মী রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
বড়খেরী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের বলেন, ১৭ বছর আ. লীগের এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে এমন সম্পর্ক ছিল, মনে হতো তার পরামর্শ ছাড়া আ.লীগ কোনো সিদ্ধান্তই নিতো না। আমরা যারা বিএনপি করতাম, তারা ঠিকমতো ঘর থেকে বের হতে পারেনি। অথচ, মিজান ১৭ বছর কোনো হামলা-মামলার শিকার না হয়ে ৫ আগস্টের পর হঠাৎ বিএনপির বড় নেতা হয়ে গেছেন। তার কারণে দলের ত্যাগী নেতারা অসহায়।
এসব অভিযোগ নাকচ করে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান বলেন, আমি রাজপথের ছেলে। ১৭ বছর আ. লীগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। আ. লীগ নেতারা আমাকে বড়খেরী ইউনিয়ন সভাপতি দিতে চেয়েছিল। আমি রাজি হয়নি। আমার গোটা পরিবার বিএনপি সমর্থিত।
বড়খেরী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরনবী নোমান বলেন, ২০১৭ সালে আমি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। তখন মিজান ধানের শীষের বিপক্ষে গিয়ে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। সে বহুরুপী। যখন যে দল ক্ষমতায় যায়, তখন সেই দলের পক্ষ হয়ে কাজ করেন, আর নিজের আখের গোছান।
উপজলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজ উদ্দিন বলেন, মিজান ৫ আগস্টের আগে করলো আ.লীগ। পরে এসে আমাদেরকে ধরলো, তখন সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাকে সুযোগ দেওয়া হয়। এখন সে দলের মধ্যে গ্রুপিং তৈরী করতে চায়। ওই ইউনিয়নটি নিয়ে একটা ঝামেলার মধ্যে আছি। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে বিএনপিকে মানুষের সামনে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।