সেই ১৯৭৮-৭৯ সালের সময়কালের কথা। আমি তখন অস্টম শ্রেণীর পড়ুয়া ছাত্র। আমার স্কুলের নাম খলিসাকোটা হাই স্কুল। গ্রামের নাম সোনাহার, বানারীপাড়া উপজেলা যা বরিশাল জেলার অন্তর্গত। ঐ সময় স্কুল কলেজে প্রতিবছর নানা বার্ষিক খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো ধুমধামে। অনেক স্কুলে মঞ্চে নাটক হতো রাতের বেলায়। আসলে সেই সব কথা এখন আর মনে করতে পারছি না। মনে করলে অনেক কষ্ট লাগে, কারণ তখনকার সময় লেখাপড়া, স্কুল, শিক্ষক, অভিভাবক কর্মকান্ড ও সামাজিক অবস্থা এখন আর দেখা যায় না। যাক সে কথা তুলনা করতে চাই না। তুলনা করার মতো কিছুই আর বাকি নাই। আমার সেই শান্ত-সবুজ দিনের কথা মনে পড়লে আজও হৃদয়ে শিহরণ জাগে।
আমি সেই বছর স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বেশ ভালো ফলাফল অর্জন করি। লংজাম্প, হাইজাম্ম ও দৌঁড়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছিলাম। আমাকে অনেকে ঐ সময় অভিন্দন জানিয়েছে, আমার খেলায় উৎসাহ দিয়েছে। বন্ধুরা তো বেজায় খুশি। দিন গড়িয়ে বিকেল। মাঠে মাইকের শব্দে কারো কথা শোনা দায়। খেলাধুলার সব আয়োজন শেষ, এবার পুরুষ্কার গ্রহণের পালা। মাইকে তো নানা ঘোষণা দিয়ে চলছে। প্রধান অতিথি, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট জনের নামও ঘোষণা করছে হরদম। পুরুষ্কার দিবেন তখনকার সময়ের এমপি/মন্ত্রী এ কে ফয়েজুল হক, যিনি বাংলার বাঘ শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের পুত্র। কিন্তু তিনি আসতে পারছিলেন না জরুরী কাজ থাকায়। আসলেন তার স্ত্রী রুকসানা হক। মাইকে বারে বারে ঘোষণার মধ্যে যে যার পুরুষ্কার গ্রহণ করছে ইতোমধ্যে। এবার আমার পালা, আমি তার হাত থেকেই পুরষ্কার গ্রহণ করি। আমার মনে আছে ঐ অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিক আসছিলেন সম্ভবত প্রধান অতিথি রুকসানা হকের সাথে। আমি একটু দূরন্তই ছিলাম। কোনভাবে তার সম্পর্কে জানতে পারলাম তিনি ইত্তেফাক থেকে আসছেন। তখন ইত্তেফাক পত্রিকা সবাই চিনে। আমিও চিনতাম তবে পড়ার সুযোগ ছিলো না বা পত্রিকা সম্পর্কে তেমন আগ্রহ জন্মায়নি। আমাদের বার্ষিক্র ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নিউজ ছাপানো হয়েছিলো কিনা তাও জানিনা। তবে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে যে সাংবাদিক আসছিলেন তাকে যে সমাদর মিসেস ফায়জুল হক, আমার স্কুল কর্তৃপক্ষ ও উপস্থিত সবাই করছিলেন তা দেখে আমি ভাবনায় পড়ছিলাম। ভাবছিলাম সাংবাদিকের এতো দাম ও সম্মান! পরবর্তীতে খবর ছাপানোর ব্যাপারে আমার মামার বন্ধু সামসুল আলম জুলফিকার ভাই আমার নাম বরিশাল থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। আমার নাম পত্রিকায় দেখে আমি তো অবাক ও অভিভূত। তা হলে তিনটি ঘটনা ঘটে গেলো আমার অবচেতন মনে। প্রথমত: ইত্তেফাক, দ্বিতীয়ত: প্রধান অতিথির মতো সাংবাদিককে সম্মান ও তৃতীয়ত: আমার নাম পত্রিকায় ছাপা। এর পর থেকে পত্রিকা ও সাংবাদিক বিষয় আমার বেশ আগ্রহ জন্মায়।
ঐ সময়ে গ্রামে/বাজারে বসে পত্রিকা পড়া দুর্লভ। দোকানে কেউ রেখে গেলে ঐ পত্রিকা ভাঁজ-করা অবস্থায় চোখে পড়তো। ফার্মেসির কাউন্টারে কখনো একটি পুরনো সংখ্যা পাওয়া যেতো। স্কুল কিংবা কলেজের প্রধান শিক্ষকের টেবিলেই সাধারণত নতুন সংখ্যা আসতো। সেখানে পত্রিকা দেখলেই দেখতে মন চাইতো কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। আর আমি তো কেবল মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিবো, বড়রাই পড়তে পারছেন না তার মধ্যে আবার আমি?
আমাদের বাজারে একটি ঔষুধের ফার্মেসি ছিলো সেখানে ইত্তেফাক পত্রিকা রাখা হতো। তা পড়ার বা দেখার সুযোগ বা সাহস ছিলোনা। ঐ ইত্তেফাক পত্রিকাটি স্থানীয় গণমান্য ও চাখার কলেজের শিক্ষকরা পড়তেন। আমার মামা মু. আজিজুল হক চাখার কলেজের শিক্ষক বিধায় দু’একদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় চোখ বুলাতে পারতাম অতি সাহসে, বলছিলাম না আমার একটু দূরন্তপনার ভাব আছে। বড়দের হাতে পত্রিকা দেখলে মনে হতো, জ্ঞানের আলো যেনো তাদের চোখে-মুখে ভাসছে। তাদের মনোযোগ, তাদের আগ্রহ, তাদের পড়ার ধরণ সবকিছুই আমাকে বিমোহীত করতো। গভীরভাবে টেনে নিতো শব্দের জগতে, খবরের জগতে, ইত্তেফাকের জগতে আর সম্মানের জগতে। আস্তে আস্তে এসএসসি পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছি। পত্রিকা সম্পর্কে তো ধারণা ইতোমধ্যে জন্মে গেছে পুড়োদমে। তখন এটা জানতে পারছিলাম বাংলা ভাষায় প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল ‘সমাচার দর্পণ’, যা ১৮১৮ সালে শ্রীরামপুরে প্রকাশিত হয়। তবে, ‘সংবাদ প্রভাকর’ ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা, যা ১৮৩১ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে শুরু হলেও ১৮৩৯ সালে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর পর তো আর থেমে থাকেনি পত্রিকা ও পত্রিকার কাজ। এখন ২০২৫ সাল। নয়া যামানা, নয়া শতাব্দী, অবরাতি মিডিয়া ও তথ্য প্রযুক্তি। তথ্য প্রযুক্তির সাফল্য আকাশ ছোঁয়া। যাক এসক কথা, আসল কথায় আসি। এর পর পত্রিকা বা সাংবাদিক দেখলেই আমার মনে কৌতুহল জাগতো। কোন মানুষ যদি সাংবাদকি বা পত্রিকা সমম্পর্কে জানতে চান বা জিজ্ঞেস করলে ইত্তেফাক বলেই সবাই জানতো। অন্য কোন পত্রিকায় চাকরি করেন বা সাংবাদিকতা করেন সে কথা বল্লেও মানুষ বলতো ‘‘ও ইত্তেফাক’’। আমিও ঢাকার পত্রিকার খবর জানতে চাইলে বা পড়তে চাইলে ইত্তেফাকের কথাই জানতাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মানুষ বিবিসি সংবাদ মাধ্যমে সম্পর্কে জানতো। বিবিসির সংবাদকে বেদবাক্য মনে করতো, আমরাও করতাম। আসলেও তাদের সংবাদ চোখ বুঝে বিশ^াস করা যেত। আমার মনে হয় পুড়ো বাংলাদেশের মানুষও তাই করতো। আমি যখনকার সময়ের কথা বলছি তখন থেকে আরো ২০ বছর বাংলাদেশের ইত্তেফাক পত্রিকাকেও আমরা বিবিসির সংবাদের মতো বিশ^াস করতাম, ভালোবাসতাম, গ্রহণ করতাম ও এখনও করছি। আমাদের কাছে ইত্তেফাকই একমাত্র সঠিক, নির্ভুল তথ্য ও বিশ^াসযোগ্য সংবাদ মাধ্যম বলে মনে হতো। ইত্তেফাকের সংবাদকেও বেদবাক্য মনে করতো পাঠক। পত্রিকা, সাংবাদিক মানেই ইত্তেফাক। তখনতো এতো কিছু জানতে পারছিলাম না, যা এখন জানি। এসএসসি, এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হই বরিশাল বিএম কলেজে, তখনও ইত্তেফাক। ঐ সাংবাদিক, পত্রিকায় নাম ছাপানো, ইত্তেফাক এসবের গল্প তো আগেই বলেছি। তখন ভাবছিলাম বড় হলে সাংবাদিকই হবো! সেই যে নেশা ও চেষ্টার ফলে বিএম কলেজে ভর্তি হয়ে তা পূরন হলো। হয়ে গেলাম জেলার সাংবাদিক (দৈনিক শক্তি)। সাংবাদিকের কিছুই জানিনা চেষ্টা করতে থাকলাম। ইত্তেফাককে মনেপ্রাণে ভালোবাসলাম ও অনুসরণ করলাম। অনেক ত্যাগ-তিতিখ্যা ও সাধনার এক পর্যায় সত্যি সত্যি ক্ষুদে সাংবাদিক হয়ে গেলাম তো? তবে ইত্তেফাকের ঐ ১৯৭৮ সালের সাংবাদিক হতে পারলাম না। পত্রিকা, সাংবাদিক, নিউজ ও সম্মান এখন আর মনে হয় সেইরকম নাই। এখন আর ঐভাবে কেউ পাত্তা দেয় না। পাত্তা দেন, বিপদে পড়লে। সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার পরশ বুলায় কিনা আমার জানা নেই। সেরকম সাংবাদিকের হয়তো অভাব বা আমার ভাবনায় ভুল। এখন বিশ^ মিডিয়ার যুগে আমরা অবগান করছি। সোস্যাল মিডিয়া জমজমাট, অবারিত সংবাদ মাধ্যম ও নেটের দুনিয়া। অনেক সুবিধায় যখন ভালো ফল দেয় তেমনি তেতো ফলও দেয়। সেই যে ইত্তেফাক বা অন্যান্য হাজারো পত্রিকা পড়ছি, বাস্তবে ১৯৭৮ সালের সম্মান, ভালোবাসা, সততা ও নিরাপত্তা আছে কিনা আমার প্রশ্ন? ঐ সময় পৃথিবীকে জানার দরজা ছিলো ক্ষুদ্র কিন্তু আমার চোখে ছিলো তার চেয়েও বিশাল কৌতুহল। আর সেই কৌতুহলের প্রথম আলো এসে পড়েছিলো একটি ছাপানো পত্রিকার পাতায় যার নাম ছিলে দৈনিক ইত্তেফাক।
তাই ইত্তেফাক পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়লেই যেনো আমাকে আলাদা সম্মানে দেখা হতো। আর আমিও পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে অদ্ভুুত এক আলো অনুভব করতাম। মনে হতো এই অক্ষরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অন্য এক অন্য রাজ্য। কিন্তু আমার অন্তরের গভীরে যে আগুনটি জ্বলে উঠেছিলো তা ইত্তেফাক তার কালিমাখা পাতায় জ্বালিয়েছিলো। আজ আমি সাংবাদিকের পরিচয় পরিচিত। যে পেশা ছিলো আমার শৈশবের স্বপ্ন, কৈশোরের কৌতুহল। স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইত্তেফাকের পাতায় লেখা খবরই ছিলো আমার সাংবাদিক হওয়ার প্রথম অনুপ্রেরণা। যে কারো শৈশবের সকাল মানেই ছিল বড়দের হাতে ইত্তেফাক। সেখানে খবরের কাগজের পাতায় ভেসে উঠত দেশ, সময় আর মানুষের গল্প। সেই দৃশ্য দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম আজও ইত্তেফাককে ভালোবাসে, কারণ এতে আছে এক ধরনের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং সত্য অনুসন্ধানের শক্তি। অন্যদিকে ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্ম সংবাদ পায় মুহূর্তে, সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল অ্যাপেই তাদের দুনিয়া। তবু আমার মনে হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও ইত্তেফাক টিকে আছে বিশ^াস, বিশ্লেষণ ও ঐতিহ্যের শক্তিতে। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু সত্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কখনো বদলায় না। এটাই ইত্তেফাকের বেঁচে থাকার মূল কারণ। আজ এই দিনে আমার প্রত্যাশা একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও স্বাভাবিক গণমাধ্যম, যা আমাদেরকে দিক নির্দেশনা দিতে পারে। – মুহাম্মদ মিজানুর রহমান