• ঢাকা, বাংলাদেশ বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ন

শেখ হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ড, মামেনের সাজা

রিপোর্টার নাম: / ১৮২ জন দেখেছে
আপডেট: বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫

ডেস্ক রিপোর্ট: গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় দেওয়া হয়েছে। তবে সমানভাবে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার পরও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজসাক্ষী হয়ে ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালকে বিচার কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করায় মামুন এই সাজা পেয়েছেন।

গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সম্পত্তি এই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত আন্দোলনকারী, শহীদ ও আহত আন্দোলনকারীদের মধ্যে তাদের ক্ষতির মাত্রা অনুপাতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনাকে সাজা দেওয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল বলেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও উসকানি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। তাকে এক নম্বর অভিযোগের অধীনে দুটি অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো।

দুই নম্বর অভিযোগের অপরাধ বর্ণনা করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এই অভিযোগের অধীনে শেখ হাসিনাকে দুটি অপরাধের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি অপরাধ হচ্ছে জুলাই গণআন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। এই নির্দেশনা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ ৩(১)(ক), ৩(২)(ছ) (জ) ও ৪(১) (২) (৩) ধারার অপরাধ সংঘটন করেছেন। দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে, শেখ হাসিনার এই নির্দেশ অনুসরণ করে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা ও একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া। এই দ্বিতীয় অভিযোগের অধীনে তিনটি অপরাধে সাজা ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এসব অপরাধের জন্য তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

এসব অপরাধে আসামি আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সমানভাবে দায়ী বলে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে উল্লেখ করেন। আসামি আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য। কিন্তু এই আসামি রাজসাক্ষী হয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন। সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশে তার এই সাক্ষ্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করেছে। ফলে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন। সবকিছু বিবেচনায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এই রায়ের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সারা দেশের আন্দোলনকারীদের খুনের উদ্দেশ্যে যৌথভাবে একে অপরের সহযোগিতায় কাজ করেছেন। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাতে এটা প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন, স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত সচিব (পলিটিক্যাল) টিপু সুলতান, অতিরিক্ত সচিব রেজা মোস্তফা, এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশিদ, র্যাব ডিজি ব্যারিস্টার হারুন-অর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসারের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে আমিনুল হক, এনটিএমসি চিফ মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, ডিজিএফআই প্রধান ও এনএসআই চিফকে নিয়ে কোর কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ৯ জুলাইয়ের পর থেকে রাতে নিয়মিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় এই কোর কমিটির মিটিং বসত।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তার সাক্ষ্যে আরও বলেন, কোর কমিটির কাছে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দশনা আসত। তিনি আরও বলেছেন, আন্দোলনের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের দমনে ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। কোর কমিটির একটি মিটিংয়ে শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। সেখানে উপস্থিত অতিরিক্ত ডিআইজি জোয়ার্দ্দারের মাধ্যমে সারা দেশের পুলিশের মধ্যে এই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

তিনি তার সাক্ষ্যে আরও বলেছেন, ওবায়দুল কাদের ও জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছিলেন, আন্দোলনকারীদের দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এই বক্তব্য শুনেই ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়া প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সারা দেশে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তার সাক্ষ্যে আরও বলেছেন, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে গত বছরের ২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন পর্যবেক্ষণে যাচ্ছিলেন। ওই যাত্রাপথে যখন যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পৌঁছান, তখন ওয়ারী জোনের ডিসি ইকবাল তার মোবাইল থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি ভিডিও দেখান, যেখানে বলতে শোনা যায়—আমরা একটাকে গুলি করি, সেই একটাই পড়ে যায়, একজনই আহত হয়, অন্যরা নড়ে না। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা বলতে পারি, তিন অভিযুক্ত যৌথভাবে অপরাধ করেছেন। শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের কর্মী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সারা দেশের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও জনগণের ওপর হামলা, ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে চানখাঁরপুলের ৬ জনসহ প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে আহত করে। আশুলিয়ায় ৬ জনকে হত্যা করে লাশ পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

রায়ে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর চালানো এই হত্যাকাণ্ড এবং সংঘাত প্রায় সারা দেশে সংঘটিত হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তা তার সাক্ষ্যে বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে প্রায় ৫০টি জেলায় এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার হয় ৪১টি জেলায়। আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণেও দেখেছি, দেশের বিভিন্ন জেলায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটা পরিষ্কার যে, সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে আদেশ ছিল, এটা ছিল বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগত। যে কারণে এক নম্বর অভিযোগের অধীনে হত্যার আদেশ প্রদান ও উসকানি প্রদান করে এবং অপরাধ দমনে ব্যর্থতার কারণে শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন। একইভাবে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে দুই নম্বর অভিযোগের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন। অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে সহযোগিতা করে দুই নম্বর অভিযোগের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সব সহযোগী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কর্তা ছিলেন। দলীয় কর্মী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানের সঙ্গে তার সুপিরিয়র রিলেশনশিপ (ঊর্ধ্বতন সম্পর্ক) ছিল। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশপ্রধানের সুপিরিয়র ছিলেন। তাদের মধ্যে সুপিরিয়র অ্যান্ড সাব-অর্ডিনেট রিলেশনশিপ ছিল। সে অনুসারে সব পুলিশ কর্মকর্তা পুলিশপ্রধানের অধীনে ছিলেন। তারা সবাই পুলিশপ্রধানের অধীনে কাজ করতেন। শেখ হাসিনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশপ্রধান মামুনের ওপর ঊর্ধ্বতন হিসেবে নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি অপরাধীদের বিরুদ্ধে। একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় ছিল। পুলিশপ্রধানসহ তার অনুসারী অন্য অফিসারদের অপরাধ দমনে পদক্ষেপ নেওয়ার। কিন্তু তিনি সেটা নেননি। একইভাবে পুলিশপ্রধানও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব হিসেবে অপরাধ দমনে ভূমিকা না রাখায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী। কিছু সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা পরোক্ষভাবে তার ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় স্বীকারও করে নিয়েছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ এদেশের মানুষের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছে, তাতে সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয় ভেঙে গেছে। আন্দোলনকারীদের যেসব ভিডিও দেখানো হয়েছে এজলাসে এবং ভিকটিম সাক্ষী যারা সাক্ষ্য দিতে আসেন, যারা তাদের মাথার খুলি, চোখ, নাক, কান, হাত, পা হারিয়েছে, তা দেখলে যে কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। ফলে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যে কোনো মূল্যে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে ব্যাহত হতে দেওয়ার সুযোগ নেই।

রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশন থেকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের জন্য তাদের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি এই মামলার বিষয়বস্তু না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে রাজি নয়।

সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর আদালত বসে ৪৫৩ পৃষ্ঠার ছয় অংশের রায়ের কথা উল্লেখ করেন। রায়ের পূর্ব মুহূর্তে আদালত প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা, ডিফেন্স কাউন্সেল, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এরপর রায়ের প্রথম অংশ বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং দ্বিতীয় অংশ পড়ে শোনান বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ। আর দণ্ডসহ শেষাংশ ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। রায় শুনতে আদালতে আসেন জুলাই শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান, মীর মুগ্ধের ছোট ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, আহত জুলাই যোদ্ধা, মামলার সাক্ষী, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র সৈয়দ ওসমান হাদী প্রমুখ।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামীম, প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদসহ অন্য প্রসিকিউটররা। পলাতক দুই আসামির পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, জুলাই শহীদরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন, রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে, প্রসিকিউশন পক্ষ ন্যায়বিচার পেয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র নিযুক্ত পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের আইনজীবী আমির হোসেন রায় মেনে নিয়ে বলেন, রায়টা আমার পক্ষে হয়নি, বিপক্ষে গেছে। এজন্য আমি ক্ষুব্ধ। কষ্ট লালন করতেছি। আসামিদের ফাঁসির রায়ে আমি কষ্ট পেয়েছি। রায় ঘোষণাকালে আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন কারাবন্দি একমাত্র আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। মামলার বিচারের শুরু থেকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান পলাতক। দুজনই এখন ভারতে অবস্থান করছেন। রায়ের সময় আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীতে এজলাস ছিল পরিপূর্ণ।

মামলার পূর্বাপর: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারায় এই আন্দোলনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। এরপর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার করার সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রথম মামলাটি (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। রায় হতে সব মিলিয়ে লেগেছে ৩৯৭ দিন।

প্রথম দিকে এ মামলায় শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি ছিলেন। চলতি বছরের ১৬ মার্চ এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করার আবেদন করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) এবং ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর চলতি বছরের ১২ মে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

গত ১ জুন শেখ হাসিনাসহ এই তিন আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এই তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। এই পাঁচ অভিযোগে তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের দিন (১০ জুলাই) সাবেক আইজিপি মামুন গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হওয়ার আবেদন করেন। এরপর ঐতিহাসিক এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে। এ ছাড়া স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। সর্বমোট ৫৪ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার শুনানিতে উঠে এসেছে জুলাই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে উসকে দিয়ে গৃহযুদ্ধ লাগানোর চেষ্টাও করেছিলেন। তাদের সাক্ষ্যে জুলাইয়ের গণহত্যা, নৃশংসতা, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম-খুনসহ নানা ভয়ংকর নির্যাতনের চিত্র উঠে আসে।

গত ১২ অক্টোবর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২৩ অক্টোবর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড চান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনি যুক্তিতর্কে এ মামলা থেকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের খালাস আবেদন করেন। রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুনেরও খালাস আবেদন করেন তার আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।

যেসব অভিযোগে সাজা: জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নির্দেশদাতা উল্লেখ করে ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেগুলো আমলে নিয়ে বিচার করেন ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগগুলোকে দুটি অভিযোগে ভাগ করে মোট ৬টি অপরাধে সাজা দেওয়া হয়েছে আসামিদের। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার মামলার রায়ে মোট ২টি অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আর ৬টি কাউন্ট (অপরাধ) ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে অভিযোগ-১-এ ৩টি কাউন্ট। কাউন্ট ১: ১৪ জুলাই ২০২৪ তারিখ গণভবন সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকার বলে উসকানিমূলক বক্তৃতা প্রদান। কাউন্ট ২: ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বলে তাদের ফাঁসি দেব মর্মে উসকানি ও আদেশ দেন। অপরাধ সংঘটনে আসামিরা অধীনদের কোনো বাধা প্রদান করেননি। কাউন্ট ৩: এরই ফলে রংপুরে আবু সাঈদকে পুলিশ কর্তৃক গুলি করে হত্যা। এতে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আর অভিযোগ ২-এ ৩টি কাউন্ট (অপরাধ)। এর মধ্যে কাউন্ট ১: ১৮ জুলাই, ২০২৪ তারিখ শেখ হাসিনা সঙ্গে তাপসের এবং পরে হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে কথোপকথনে শোনা যায়, শেখ হাসিনা ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয়, আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হেলিকপ্টার এবং উইপন ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অপরাধ সংঘটান আসামিরা তার অধীনদের কোনো বাধা প্রদান করেননি। কাউন্ট ২: যার ফলে ৫ আগস্ট, ২০২৪ চানখাঁরপুলে ৬ জন আন্দোলনকারীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। কাউন্ট ৩: যার ফলে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখ পুলিশ কর্তৃক আশুলিয়ায় ৬ জন আন্দোলনকারীকে হত্যার পর তাদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব অপরাধে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড। দুই আসামির সব সম্পদ সরকারের পক্ষে বাজেয়াপ্ত করা হয়। সরকার জুলাইয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বিতরণ করতে বলেছে। এ ছাড়া উভয় অভিযোগে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের ৫ বছর কারাদণ্ড হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরিতে আরও নিউজ