মুহাম্মদ মিজানুর রহমান: পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, বন বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে। তাই প্রকৃতির প্রাণ বন। বনের সুরক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বন না থাকলে পরিবেশ বিপন্ন হবে। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজন সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ। আর বনের বৃক্ষ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন, ছায়া, ফল ও ফুল দেয়। বন্যপ্রাণীদের খাবার ও আশ্রয় দেয়। বৃক্ষ ভূমিক্ষয়, ঝড়-জলোচ্ছাস ও বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে। কথাগুলো বলেন, বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজসেবক আব্দুর রশিদ হাওলাদার।
বিশেষজ্ঞগণ জানান, জলবায়ূ পরিবর্তন, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের কারণে দেশের জীববৈচিতত্র্য এখন হুমকির মুখে। এর ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই হুমকি মোকাবিলায় জল, বন, ও পরিবেশগত সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। পরিবেশবিদরা বলেন, ভাঙাগড়ার মধ্যে বনের আয়তনে ছোট, আশেপাশে নানা শিল্প স্থাপনা তৈরি, জলবায়ূ পরিবর্তন, বন্যপ্রাণী শিকার, দূষণ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাছকাটা দক্ষিণাঞ্চালের সুন্দরবনকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের রামসার কনভেনশন অনুযায়ী সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমি। এই কনভেনশনে ১৯৭২ সালে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। যার ফলে কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী সুন্দরবনের ক্ষতি হতে পারে, এমন কোনও তৎপরতা বাংলাদেশ চালাতে পারবে না। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই বনের আশেপাশে নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমি অধিগ্রহণ ও মানুষের অবাধ বিচরণ ঘটছে। বনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবচিত্র পুরোই বিপরীত। এখানে কমেছে গাছ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী।
পরিবেশবিদরা আরো বলেন, অপরিকল্পিত ও পরিবেশের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামতো ব্যবহারের ফলে ‘পরিবেশের দেয়াল’ সুন্দরবন নষ্ট করছি আমরা নিজ হাতে। লবণাক্ততা পরিমাপে সুন্দরবনের চারপাশকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। বেশি লবণাক্ত, মাঝারি লবণাক্ত এবং কম লবণাক্তপ্রবণ এলাকা। প্রথম ভাগে রয়েছে সাতক্ষীরা, মাঝে খুলনা ও মোংলা, কম লবণাক্ত বাগেরহাট। লবণাক্ত পানির উপর নির্ভর করে গাছের ইকোসিস্টেম তৈরি হয় জানিয়ে তারা আরো বলেন, যখন জোয়ারের লবণাক্ত পানি যাচ্ছে বনের ভেতরে, তখন লবণ কম সহ্য করতে পারা সুন্দরবনের প্রধান গাছ সুন্দরী, পশুর, ধুন্দুলের মতো গাছ কমে যাচ্ছে। লবণের কারণে চারা গাছ থেকে গাছ বড় হচ্ছে না, বীজ নষ্ট হচ্ছে, অঙ্কেুরোদগম হচ্ছে না। পাখিরাও মাইগ্রেট করছে, খাবারের অভাবে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এসব জায়গায় চরে বেড়ানো কাঁকড়া, পাখি, ক্ষদ্রপ্রাণি কমছে আশঙ্কাজনকভাবে।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনে ৫২৮ প্রজাতির বৃক্ষ ও লতাগুল্ম আছে। আছে ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং নয় প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনের খাল-বিলে আছে ২৫০ প্রজাতির মাছ। আছে বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক। আছে নানা ধরনের ছত্রাক, শ্যাওলা। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সুন্দরবনকে। এতে করে সুন্দরবনের সামুদ্রিক জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। মাছের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণীও বাঁচতে পারছে না এখানে। বিষের কারণে মাছের পোনা মারা যাচ্ছে। সুন্দরবন লাগোয়া মো. মেহরাজ বলেন, বিষের প্রভাবে জলজ প্রাণী কমে যাচ্ছে। বিষাক্ত পানি পানে বাঘ, হরিণসহ অন্য প্রাণীর অসুস্থ হওয়ার খবরও আমরা জানি। বিষ প্রয়োগে নির্বিচারে মাছ ও জলজ প্রাণী নির্মূলের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত কাঠ পাচার চলছে। ফলে মাছ কমছে, গাছ কমছে, কাঁকড়া কমছে, অন্য ক্ষুদ্র প্রাণী কমছে। সুন্দরবনের হুমকি দৃশ্যমান, অথচ প্রতিকার-প্রতিরোধ করার কেউ নেই। অন্যদিকে সুন্দরবনের আরেক বড় হুমকির কারণ মোংলা বন্দর ও নদীতে চলাচল নৌযান। বন থেকে মাছ, মধু বা গোলপাতা আহরণের জন্য অনুমতি নিতে হয় বন বিভাগের। বছরের বড় একটি সময় বন সম্পদ সংগ্রহে থাকে নিষেধাজ্ঞা। আবার বেড়েছে বনের অভয়ারণ্য এলাকা। এতে বনজীবীদের মাছ ধরার জায়গা কমে যাচ্ছে।
বনের গুরুত্ব ও এর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সবার কাছে তুলে ধরতে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক বন দিবস। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২১ মার্চকে আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সবুজ-শ্যামলীময় বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরণের বন রয়েছে, যেগুলো পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখছে । কিন্তু বিভিন্ন কারণে বন উজাড়ের ফলে প্রকৃতিতে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রভাব। তাই, সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনকে টেকসই উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে বাসযোগ্য সুন্দর একটি পরিবেশবান্ধব পৃথিবী।